ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর আপত্তির মধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আগামী ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় জি২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সুযোগ হিসেবে এই সম্মেলনে পুতিনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান রুবিও।
তিনি বলেন, ‘আমরা পুতিনকে জি২০-তে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আমরা মনে করি, এটি শুধু প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নয়, অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গেও তাঁর আলোচনার একটি সুযোগ। আমরা আশা করছি, তিনি এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন।’
রুবিওর বক্তব্যের পর ক্রেমলিন জানায়, আমন্ত্রণটি রাশিয়া কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে বিবেচনা করবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, রাশিয়া আমন্ত্রণের জন্য কৃতজ্ঞ এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক পর্যায়ে নেওয়া হবে।
পুতিন আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে ২০১৯ সালের পর এটি হবে জি২০ নেতাদের সম্মেলনে তাঁর প্রথম সশরীরে অংশগ্রহণ। ২০২৩ সালে তিনি জি২০ সম্মেলনের একটি অধিবেশনে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়েছিলেন। ডিসেম্বরের সম্মেলনটি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মিয়ামিতে ট্রাম্প ন্যাশনাল ডোরালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এটি পুতিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সফরও হবে। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে আলাস্কায় ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তিনি। সেই বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হলেও যুদ্ধের অবসানে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
পুতিনকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশের আপত্তি রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্পৃক্ত করার মার্কিন উদ্যোগ নিয়ে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনার জবাবে রুবিও বলেন, কেবল যেসব দেশের সঙ্গে মতের মিল রয়েছে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আন্তর্জাতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তাঁর ভাষ্য, মতভেদ থাকা পক্ষগুলোকেও আলোচনার টেবিলে বসতে হবে।
পুতিনকে জি২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর খবর এমন সময়ে এলো, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে একটি সীমিত যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে।
মার্কিন প্রশাসন ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের যুক্তি, এ ধরনের হামলা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়াতে পারে। তবে রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষের হামলা অব্যাহত থাকায় এ বিষয়ে স্থায়ী সমঝোতা হয়নি।
রুবিও বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা কমানোর উদ্যোগ বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে এ ধরনের কোনো যুদ্ধবিরতি যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জি২০ বা ‘গ্রুপ অব টোয়েন্টি’ বিশ্বের প্রধান অর্থনীতি ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরাম। বর্তমানে এতে ১৯টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ)—দুটি আঞ্চলিক সংস্থা সদস্য হিসেবে রয়েছে।
জি২০ সদস্যরা সম্মিলিতভাবে বিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), ৭৫ শতাংশের বেশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জি২০ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম হিসেবে কাজ করে।