রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির অভ্যন্তরে নতুন নেতৃত্বের সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে বিএনপির মহাসচিবের পদটি শূন্য হবে। ফলে দলের ভেতরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তার স্থলাভিষিক্ত কে হচ্ছেন?
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে দলের অবস্থান চূড়ান্ত করার পাশাপাশি মহাসচিব পদে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
মহাসচিব পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং গণমাধ্যমে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন রুহুল কবির রিজভী। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় উপস্থিতির পাশাপাশি তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগও তাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে এগিয়ে রাখছে বলে মনে করছেন দলের নেতাদের একটি অংশ।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, মহাসচিব দায়িত্ব পালনে অনুপস্থিত বা অক্ষম হলে জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কোনো দায়িত্বশীল নেতা সাময়িকভাবে সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে রিজভীর নামই প্রথমে সামনে আসতে পারে বলে দলের কয়েকজন নেতা মনে করছেন।
তবে এ বিষয়ে রিজভী নিজে এখনো কোনো তথ্য জানেন না বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
মহাসচিব পদ নিয়ে বিএনপির ভেতরে এখনো চূড়ান্ত ঐকমত্য তৈরি হয়নি। দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করেন, মহাসচিব শুধু সাংগঠনিক দায়িত্বের পদ নয়; দলের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণেও এ পদের ভূমিকা রয়েছে। তাই স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যকে মহাসচিব করা হলে নীতিনির্ধারণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় আরও কার্যকর হতে পারে।
এই বিবেচনায় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামও আলোচনায় রয়েছে।
বিএনপির গঠনতন্ত্রে স্থায়ীভাবে ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ নামে কোনো পদ নেই। ফলে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দল তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে সাময়িক দায়িত্ব দেবে, নাকি নতুন মহাসচিব নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে—সেটি দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
স্থায়ীভাবে মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতীয় কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কাউন্সিলের মাধ্যমেই মহাসচিব নির্বাচিত হন। তবে কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অন্তর্বর্তী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করার আলোচনা বিএনপির কাছে শুধু একজন নেতাকে সাংবিধানিক পদে পাঠানোর বিষয় নয়। দলটির নির্বাচনি ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর। ফলে রাষ্ট্রপতির পদটি অনেকাংশে আনুষ্ঠানিক। তবে জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বঙ্গভবনের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক গুরুত্ব বাড়তে পারে।
সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে দায়িত্ব নিচ্ছেন, তা শুধু আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে না। ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক কাঠামোর দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজনকে প্রয়োজন, যিনি রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ, দলের প্রতি আস্থাশীল এবং একই সঙ্গে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে সক্ষম।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন এবং সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
দলের কঠিন সময়গুলোতে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মধ্যেও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন হিসেবেও তিনি পরিচিত।
দলীয় সূত্রগুলোর মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দলের ভেতরে গ্রহণযোগ্যতার কারণেই রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম গুরুত্ব পাচ্ছে।
মহাসচিবের পদ দীর্ঘদিন খালি রাখার সুযোগ বিএনপির সামনে নেই। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং জাতীয় কাউন্সিলসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ফলে দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন নেতা-কর্মীরা।
রিজভীর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা এবং মাঠের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ তার পক্ষে ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে সালাহউদ্দিন আহমদের সমর্থকেরা স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে তার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ শূন্য হবে। সে ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী আসনটিতে উপনির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।
স্থানীয়ভাবে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির নেতাদের পাশাপাশি মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জার নামও আলোচনায় এসেছে। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বাবার পক্ষে প্রচারে সক্রিয় ছিলেন তিনি। তবে তাকে প্রার্থী করার বিষয়ে বিএনপির কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সামনে একসঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে শূন্য হবে মহাসচিবের পদ, সামনে আসবে নতুন নেতৃত্বের প্রশ্ন। একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে সম্ভাব্য সাংবিধানিক পরিবর্তনও দেশের রাজনীতিতে নতুন হিসাব তৈরি করতে পারে।