ইসরায়েলের কাছে ২ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৯০৭ কেজি) ওজনের ৬০ হাজার ভারী বোমা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। প্রস্তাবিত অস্ত্রচুক্তির মূল্য প্রায় ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার। এর বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং’ (এফএমএফ) কর্মসূচির আওতায় অর্থায়ন করা হবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও আল-জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রস্তাবিত চুক্তির বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। তবে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি নিশ্চিত করেনি। একই সময়ে প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট গ্রেগরি মিক্স ৪০ হাজার ২ হাজার পাউন্ডের বোমা নিয়ে প্রস্তাবিত ২৮০ কোটি ডলারের চুক্তির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ৬০ হাজার বোমার মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার এমকে-৮৪ (MK-84), ২০ হাজার বিএলইউ-১১৭ (BLU-117) এবং ২০ হাজার আই-২০০০ পেনিট্রেটর (I-2000 Penetrator)। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রথম দুই ধরনের ২০ হাজার করে মোট ৪০ হাজার বোমার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
যেসব বোমা থাকতে পারে
এমকে-৮৪ (MK-84): প্রায় ২ হাজার পাউন্ড ওজনের এই সাধারণ ব্যবহারের বোমা মূলত ভবন ও মাঝারি মাত্রায় সুরক্ষিত স্থাপনায় ব্যাপক বিস্ফোরণ ও ধ্বংস ঘটাতে সক্ষম।
বিএলইউ-১১৭ (BLU-117): এটিও প্রায় ২ হাজার পাউন্ড ওজনের সাধারণ ব্যবহারের বোমা। এতে ভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক উপাদান রয়েছে এবং এটি প্রিসিশন-গাইডেড কিটের সঙ্গে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আই-২০০০ পেনিট্রেটর (I-2000 Penetrator): প্রায় ২ হাজার পাউন্ড শ্রেণির এই ‘বাংকার বাস্টার’ শক্ত স্থাপনা ভেদ করে ভেতরে বিস্ফোরণের জন্য তৈরি। এর বহিরাবরণ সাধারণ বোমার তুলনায় বেশি পুরু ও শক্ত।
এর আগে ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইসরায়েলে কিছু ২ হাজার পাউন্ড শ্রেণির বোমার চালান সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। পরে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন। আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্রচুক্তি দ্রুত অনুমোদন করে, যাতে ৩৫ হাজার ৫০০-এর বেশি ভারী বোমা ছিল।
প্রস্তাবিত ৬০ হাজার ২ হাজার পাউন্ডের বোমার মোট ওজন প্রায় ৫৪ হাজার ৪০০ টন। আল-জাজিরার হিসাব অনুযায়ী, এ ওজন আইফেল টাওয়ারের লোহার কাঠামোর প্রায় সাত গুণ এবং ১৯৪৫ সালের টোকিওতে এক রাতের বোমা হামলায় ব্যবহৃত প্রায় ১ হাজার ৬০০ টন বোমার তুলনায় প্রায় ৩৪ গুণ বেশি।
গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে আল-জাজিরা জানিয়েছে, একটি ২ হাজার পাউন্ডের বোমা বিস্ফোরণে প্রায় ৫০ ফুট (১৫ মিটার) প্রশস্ত ও ১৬ ফুট (৫ মিটার) গভীর গর্ত তৈরি হতে পারে।
এদিকে আল-জাজিরার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গাজায় বোমা হামলায় ২ হাজার ৮৪২ জনের মরদেহ সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স দলগুলো। ওই প্রতিবেদনে এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে উচ্চতাপ ও থার্মোবারিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এসব দাবি আল-জাজিরার অনুসন্ধানের ফল; এগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
অন্যদিকে, পেন্টাগনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ মজুত ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপের কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং ইউক্রেনকে সহায়তার কারণে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রসহ কিছু অস্ত্রের সরবরাহে সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইতিহাসের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উন্নত অস্ত্র তৈরি করছে।
প্রস্তাবিত অস্ত্রচুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন চুক্তিটি ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য গ্রেগরি মিক্সও বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রস্তাবিত চুক্তিতে আপত্তি জানিয়েছেন।
সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা