বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থের বড় অংশ এখন বিনিয়োগ হচ্ছে ট্রেজারি বিলে। এতে সরকারি এই স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্রের সুদহার দ্রুত কমছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ২৬ বেসিস পয়েন্ট কমে দীর্ঘ সময় পর ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার আগের সপ্তাহে ছিল ৯ দশমিক ১৯ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশে।
এদিকে ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ০৭ শতাংশে নেমেছে। আর ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের সুদহার ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
ব্যাংকারদের মতে, মূলত দুটি কারণে ট্রেজারি বিলের সুদহার কমছে। প্রথমত, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তুলনামূলক কম। বিশেষ করে বড় ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মে পর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর আমানত প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে। আমানতের সুদহার তুলনামূলক বেশি থাকায় ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণীয় ক্ষেত্র ট্রেজারি বিল। একসময় এসব বিল থেকে ৯ শতাংশের বেশি মুনাফা পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বেশি আমানত পাওয়া বেশ কয়েকটি বড় ব্যাংক ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এতে বিলের চাহিদা বেড়ে সুদহার কমেছে।
অতিরিক্ত তারল্য ও ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ বাড়ার প্রভাবে আগস্ট থেকে শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যাংক আমানতের সুদহারও ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মূলত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি এসব সিকিউরিটিজে অর্থ খাটাচ্ছে।
এর আগে ২০২৩ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের ৯ শতাংশ সুদসীমা তুলে দিয়ে স্মার্ট (SMART) ভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা চালু করে। এরপর ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
সুদহার বাড়তে বাড়তে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একপর্যায়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। বিভিন্ন মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই সময়ে সুদহার কোনো কোনো মাসে প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি ছিল এবং কোনো কোনো মাসে ১২ শতাংশেরও বেশি উঠেছিল।
সে সময় ব্যাংকভেদে আমানতের সুদহারও ৯ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে ছিল। তবে বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য বাড়া এবং ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় সেই পরিস্থিতি বদলেছে। ফলে ট্রেজারি বিলের সুদহারও নিম্নমুখী হচ্ছে।