প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে খুব শিগগিরই ‘মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে ঘোষণা করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, আগামী সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
এদিকে নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে আয়োজিত রাজনৈতিক সমাবেশে ট্রাম্প হেসে বলেন, ‘খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করতে যাচ্ছি।’ তবে তিনি মন্তব্যটি কতটা গুরুত্ব দিয়ে করেছেন, তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের এ বক্তব্যের কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, হুমকি বা শক্তি প্রদর্শনে তেহরান ভয় পায় না। হরমুজ প্রণালি খোলা বা বন্ধ রাখার বিষয়টি ইরানের নিজস্ব এখতিয়ার বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে না নেওয়া পর্যন্ত ইরান এই অবরোধ অব্যাহত রাখবে। কোনো পোস্ট, বিমানবাহী রণতরী, নির্দেশ বা নির্বাচনী ভাষণের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দখল করা যাবে না।’
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর শুরু হওয়া সংঘাতের প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। এ পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। জাহাজ ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার মাত্র দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। আবুধাবি এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে।
সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টির বেশি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও এলএনজি এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এর প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারেও। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ৪ ডলারে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন নাগরিকদের কিছুটা বেশি দামে জ্বালানি কেনার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, একটি ‘দুষ্ট দেশকে’ পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতেই এই মূল্য দিতে হচ্ছে।
তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এর আগে বলেছিলেন, পারমাণবিক ইরানকে ঠেকানোর চেয়ে মার্কিন নাগরিকদের জন্য কম দামে জ্বালানি নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিকদের দুরবস্থা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ওঠা উদ্বেগ নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। প্রায় নয় মাস ধরে সাগরে থাকা রণতরীটির নাবিকদের পরিবার তাদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ট্রাম্প দাবি করেছেন, এ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। তাঁর ভাষ্য, রণতরীটির মোতায়েনকালও ‘যথেষ্ট দীর্ঘ নয়’।
তবে শিগগিরই ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’কে সরিয়ে একই ধরনের অন্য একটি রণতরী মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রণতরীটির পরিস্থিতি নিয়ে এরই মধ্যে মার্কিন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে কয়েকজন নাবিকের সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করার কথা উঠে এসেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হাং কাও মানসিক অবসাদে ভোগা কয়েকজন নাবিককে চিকিৎসা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও পরিস্থিতিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের জন্য গণমাধ্যমকে দায়ী করেছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নিরসনে গত জুনে হওয়া চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার জানিয়েছেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে কেবল বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে। তবে এটিকে যুদ্ধ বন্ধের আনুষ্ঠানিক আলোচনা বলা যাবে না।
চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর থেকেই ইরান তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে হামলা পুনরায় শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।