পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত দিনটি মুসলিম বিশ্বের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছর আগে এই দিনে মানবজাতির হেদায়েতের বার্তা নিয়ে আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের একই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেন।
সারাবিশ্বের মুসলমানরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদার সঙ্গে দিনটি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) হিসেবে পালন করেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তাঁর আবির্ভাব এবং ইসলামের শান্তি, সাম্য ও মানবতার বাণী প্রচার বিশ্ব ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে।
মহানবী (সা.)-এর পৃথিবীতে আগমন মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে বিবেচিত। তিনি মানুষকে অজ্ঞতা ও অন্ধকার থেকে সত্য ও আলোর পথে আহ্বান করেন। তাঁর দাওয়াত, সংগ্রাম ও আদর্শের প্রভাবে আরবের ‘জাহেলি’ সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
মহানবী (সা.) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কার সম্মানিত কুরাইশ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের আগেই তিনি পিতাকে হারান। শৈশবে হারান মা ও দাদাকেও। এরপর চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।
৪০ বছর বয়সে ৬১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি নবুয়ত লাভ করেন। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছর আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তাঁর জীবন ও শিক্ষায় সত্য, ন্যায়, মানবিকতা, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও শান্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ মুসলমানদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। তাঁর শিক্ষা ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ন্যায়, মানবিকতা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা পাওয়া যায়।
১২ রবিউল আউয়াল বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালন করবেন। এ উপলক্ষে বাংলাদেশে সাধারণ সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াত, আলোচনা সভা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। তাঁরা মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে শান্তি, সম্প্রীতি, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহার করতে হবে। একই সঙ্গে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। তিনি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্বের সব মুসলমানকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে বলেন, হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায়, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর শুভাগমন মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য ও মহিমান্বিত ঘটনা। তাঁর আবির্ভাব মানুষের সামনে সত্য ও আলোর নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পক্ষকালব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। মঙ্গলবার বাদ মাগরিব বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব সাহানে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বাদ মাগরিব বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব সাহানে ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে দেশের বিশিষ্ট আলেম-ওলামারা বয়ান করবেন।
এ ছাড়া পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সিরাত স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়েছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব ও দক্ষিণ সাহানে মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলারও আয়োজন করা হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ওয়াজ মাহফিল, কিরাত মাহফিল, হামদ-নাত মাহফিল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ বেতারের যৌথ উদ্যোগে সেমিনার এবং বাংলাদেশ বেতারে প্রচারের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শানে রচিত কবিতা পাঠের আয়োজন।
এ ছাড়া স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, সিরাত স্মরণিকা ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ, ইসলামী ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী এবং জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে মহানবী (সা.)-এর জীবন, আদর্শ, চরিত্র ও মানবতার জন্য তাঁর অবদান তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি তাঁর সুন্নাহ ও জীবনাদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে শান্তি, ন্যায়, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হবে