ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট—কেউই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে প্রথমে কে সরকার গঠনের সুযোগ পাবেন, সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগকে।
প্রেসিডেন্ট হারজোগ জানিয়েছেন, আগামী রোববার তিনি একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। আইজেনকোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতার সমর্থন পেলেও তা এসেছে মূলত ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর কাছ থেকে। অক্টোবরের নির্বাচনে এসব দল রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে। তবে দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা আগেই নাকচ করেছেন আইজেনকোট।
বৃহস্পতিবার শেষ হওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের পরামর্শ সভায় ১২০ সদস্যের নেসেটের ৬৭ জন সদস্য আইজেনকোটকে সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন ৪৬ জন আইনপ্রণেতা।
নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্র ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম তাঁর জোটের অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় সমর্থন স্থগিত রেখেছে। এতে নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা ৫৩ থেকে কমে ৪৬-এ দাঁড়িয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট হারজোগ এখনো প্রকাশ্যে কোনো পক্ষের প্রতি সমর্থন জানাননি। তিনি বলেছেন, সংখ্যাগুলো আপাতদৃষ্টিতে স্পষ্ট মনে হলেও রাজনৈতিক জোটগুলোর মধ্যে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও পারস্পরিক ভেটোর কারণে কারা সরকার গঠন করতে পারবে, তা বলা কঠিন।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পুনরায় নির্বাচন এড়াতে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের প্রধান দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট।
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, কোনো জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পায়নি। নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। আইজেনকোটকে সমর্থনকারী চারটি ইহুদি নেতৃত্বাধীন দল পেয়েছে ৪৮টি আসন। অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আসনসংখ্যা ১৯।
আইজেনকোট আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করলেও দুটি অতি-অর্থোডক্স দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাসের সমর্থন পেলে ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেন। ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম জানিয়েছে, উপযুক্ত সমঝোতা হলে তারা সমর্থন দিতে পারে। তবে শাস বুধবার নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর মধ্যে রয়েছে জয়েন্ট লিস্ট ও ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রাম)। দল দুটি যথাক্রমে ১১ ও ৮টি আসন পেয়েছে। রাম আইজেনকোটের সরকারে যোগ দিতে আগ্রহী হলেও জয়েন্ট লিস্ট সরকারে সরাসরি অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হারজোগের সঙ্গে বৈঠকে উভয় দল আইজেনকোটকে সমর্থন জানায়। তবে হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াসহ কয়েকটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি নন আইজেনকোট।
রাম নেতা মনসুর আব্বাস হামাসকে নিরস্ত্র করার পক্ষে অবস্থান নিলেও সংগঠনটিকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ইসরায়েলি আইন অনুযায়ী, আইজেনকোট পার্লামেন্টের আস্থা ভোটে জয়ী হতে পারলে ৬১টির কম আসনের সমর্থন নিয়েও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সতর্ক করে বলেছে, আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করা ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক হবে।
জয়েন্ট লিস্টের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমেদ তিবি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেছেন, আরব দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব প্রত্যাখ্যান করা হলে তা প্রমাণ করবে, ইসরায়েল সব নাগরিকের জন্য সমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়; বরং একটি ‘এথনোক্রেসি’।
আরব দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান ঘটানো। জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, আইজেনকোটকে তাদের সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় আসা থেকে ঠেকানোর জনদাবি।
বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দেওয়ার বিনিময়ে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বাড়িঘর ধ্বংস বন্ধ, অপরাধ দমন এবং রাজনৈতিক অগ্রগতির নিশ্চয়তা চেয়েছে দলগুলো।
আহমেদ তিবি এপিকে বলেন, এমন সরকার যুদ্ধের অবসান ঘটাতে না পারলেও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি এ ধরনের সরকারকে ‘মেরামত সরকার’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাম নেতা মনসুর আব্বাসও নেতানিয়াহু, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতমার বেন-গভীরের নেতৃত্বাধীন সরকারের অবসানকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
এদিকে কোনো প্রার্থী সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রথম মনোনীত ব্যক্তি ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে এ সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে। প্রথম ব্যক্তি ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। তিনিও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্ট তৃতীয় কোনো প্রার্থীকে সরকার গঠনের জন্য ১৪ দিন সময় দিতে পারে।
এরপরও সরকার গঠন সম্ভব না হলে নেসেট ভেঙে দেওয়া হবে এবং ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ইসরায়েলবিষয়ক বিশ্লেষক নেহরু জামহুর আল-জাজিরাকে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অচলাবস্থাই সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি। তাঁর মতে, পুনরায় নির্বাচন হলে বিরোধীরা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে—এমন প্রত্যাশা থেকেই নেতানিয়াহু এই পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে দেখতে পারেন।
সূত্র: আল-জাজিরা