আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়েই শনিবার (১৫ আগস্ট) এ তথ্য জানিয়েছেন।
ইরানি সংবাদমাধ্যম দেফা প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাঘায়েই বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পথের মানচিত্র নিয়ে ওমানের সঙ্গে গত তিন সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বাধার মধ্যেও ওই আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে দুই দেশ।
তিনি বলেন, ‘গত তিন সপ্তাহের আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে এবং জাহাজ চলাচলের পথের মানচিত্র নিয়ে একটি চুক্তি হয়েছে।’
বাঘায়েই জানান, চুক্তির খসড়া প্রণয়ন ও স্বাক্ষরের প্রক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দিয়েছে। এতে দেশটির প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও পরিবেশবিষয়ক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও অংশ নিয়েছে।
তবে এখনো ইরান বা ওমান—কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির বিষয়টি ঘোষণা করেনি। বাঘায়েই জানান, চুক্তির কয়েকটি বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। সেগুলো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিষয়গুলো চূড়ান্ত হওয়ার পর চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি ওমান উপসাগরকে পারস্য উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা জ্বালানি পণ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইরানকে যুদ্ধে পরাজিত করার পর হরমুজ প্রণালিকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন তিনি।
ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ওমানের সঙ্গে চুক্তির কথা জানাল তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ইরান ও ওমানের এ সমঝোতা দুই উপকূলীয় রাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্বাধীন চুক্তি। এর মূল লক্ষ্য দুই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
তবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কি না, তা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা, নৌ অবরোধ ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করবে বলে জানান বাঘায়েই।
তিনি আরও দাবি করেন, গত দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দেশটির সামরিক হুমকি ও নৌ অবরোধের অবসানও হরমুজ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। যুদ্ধের প্রথম দিনেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিদেশি জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করে ইরান। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে এপ্রিলে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
পরে ১৭ জুন ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি হলেও জুলাইয়ে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) হামলার পর পরিস্থিতির আবারও অবনতি ঘটে। এরপর দুই দেশই পরস্পরের ওপর নতুন করে অবরোধ ও বিধিনিষেধ আরোপ করে।
এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ নির্ধারণে ইরান ও ওমানের নতুন সমঝোতাকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি