আমার প্রেমের সংবাদ আজ প্রকাশ হল! লেখায় মধ্যবিত্ত সাংবাদিক

মো. মানিক হোসেন : বত্রিশ বছরের জীবনে কষ্টের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বেশ পুরোনো। এতটাই পুরোনো যে, এখন আর কষ্ট এলে তাকে অতিথি মনে হয় না; মনে হয়, বাড়িওয়ালা ভাড়া চাইতে এসেছে। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজেকে এমনভাবে একা করে রেখেছি যে, এখন একাকিত্বও আমাকে ছেড়ে যাওয়ার আগে দুবার ভাবে। সম্প্রতি সংবাদ সম্পাদনা বিভাগে চাকরি শুরু করেছি। জীবনের নতুন অধ্যায়, নতুন দায়িত্ব, নতুন স্বপ্ন। শুধু বেতনের অঙ্কটা পুরোনো দুঃখগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। এই বেতনে নিজের জীবন চালানোই যেখানে একধরনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সেখানে বিয়ে করার চিন্তা করব কীভাবে? আর কাউকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া! সে তো আমার অর্থনৈতিক সামর্থ্যের বাইরে এক বিলাসী প্রকল্প!

মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের জীবনটা অদ্ভুত। পকেটে টাকা থাকুক আর না থাকুক, মুখে একটা গাম্ভীর্য বজায় রাখতে হয়। কারণ, সমাজের চোখে আমাদেরও একটা প্রেস্টিজ আছে। সেই প্রেস্টিজ রক্ষা করতে গিয়ে কখন যে নিজের মনের দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছি, বুঝতেই পারিনি। মনে প্রেম জাগে, কিন্তু মাথায় হিসাবের খাতা খুলে যায়। কাউকে ভালো লাগলেই মনে প্রশ্ন আসে, ভালো লাগল, ঠিক আছে; এরপর? বিয়ের কথা উঠলে বাসা কোথায়? সংসার চলবে কীভাবে? বাজারের খরচ কে দেবে? আর মেয়ের পরিবার যদি জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?’ তখন কি বলব, ‘আন্টি, আপাতত মাসের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার পরিকল্পনা করছি!’

জীবনে একবার একজন নাবালিকা এসেছিল। বয়সের অঙ্ক, সময়ের হিসাব আর জীবনের বাস্তবতা মিলিয়ে সেই অধ্যায়ও একসময় অতীত হয়ে গেছে। এক বছর পর সে বিয়ে করে নিয়েছে। তার নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা রইল। তবে আমার জীবনে ঘটনাটির প্রভাব এমন যে, প্রেমের বাজারে একবার পা দিয়েই বুঝেছি এখানে অভিজ্ঞতা ছাড়াও যোগ্যতা লাগে, আর যোগ্যতার তালিকায় শুধু ভালো মানুষ হলেই চলে না। কখনো কখনো ভালো চাকরি, আর্থিক নিশ্চয়তা, সামাজিক অবস্থান। সবকিছুরই পরীক্ষা দিতে হয়। আমি অবশ্য পরীক্ষার হলে ঢোকার আগেই প্রশ্নপত্র দেখে বাড়ি ফিরে আসা প্রার্থী।

এদিকে আমার চারপাশে বহু মনীষী আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁরা গবেষণা করে, চিন্তাভাবনা করে, আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এমন সব সিদ্ধান্ত প্রচার করেন যে, তাঁদের কথা শুনলে মনে হয় আমি বুঝি প্রেমের আন্তর্জাতিক বাজারে এক বহুজাতিক কোম্পানি চালাই। বহুজনে নাকি আমার প্রতি আসক্ত, কেউ নাকি আমাকে পছন্দ করে, কেউ নাকি আমার জন্য অপেক্ষায় আছে! তাঁদের গবেষণার ফলাফল শুনে নিজেরই সন্দেহ হয়। আমি কি সত্যিই সেই মানুষ, নাকি আমার নামে অন্য কেউ প্রেমের ব্যবসা চালাচ্ছে?

বাস্তবতা হলো, আমি নিজেই প্রেমে অজ্ঞ। আমার প্রেমজীবনের অভিজ্ঞতা অনেকটা সংবাদ সম্পাদনার টেবিলে নতুন যোগ দেওয়া কর্মীর মতো। কোন খবরের শিরোনাম কী হবে, কোথায় কমা বসবে, কোথায় দাঁড়ি টানতে হবে, তা বুঝতে বুঝতেই শিফট শেষ! সেখানে প্রেমের মতো জটিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব কীভাবে? সংবাদে ভুল হলে সিনিয়ররা শুধরে দেন, কিন্তু প্রেমে ভুল হলে সংশোধনের দায়িত্ব কে নেবেন? প্রেমিকার বাবা, বড় ভাই, নাকি পুরো পাড়া?

কোনো মেয়েকে পছন্দ হলে আমার ভেতরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে। বুকের মধ্যে হৃদয়টা স্বাভাবিকভাবে কাজ করলেও মস্তিষ্ক জরুরি বৈঠক ডাকে। চোখাচোখি হওয়ার আগেই চোখ নামিয়ে ফেলি। তারপর বিশ হাত দূরে গিয়ে এমনভাবে নিশ্বাস ছাড়ি, যেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি এইমাত্র শেষ করেছি। অথচ মেয়েটি হয়তো আমাকে দেখেছেই না! আমি মনে মনে প্রেমের উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় লিখে ফেলেছি, আর সে হয়তো ভাবছে। লোকটা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ থামল কেন?

মাঝেমধ্যে হাসিও পায়। আবার হাসতে গিয়েও থেমে যাই। মনে হয়, বেশি হাসলে কেউ যদি ভুল বুঝে বসে! এ সমাজে অবিবাহিত পুরুষের হাসিরও ব্যাখ্যা লাগে। একা থাকলে সমস্যা, চুপ থাকলে সমস্যা, হাসলে সন্দেহ, কথা বললে উদ্দেশ্য। কাউকে পছন্দ করলে অপরাধবোধ, পছন্দ না করলে নিঃসঙ্গতার অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত নিজের সঙ্গে নিজেই পরামর্শ করি, ‘ভাই, তুই চুপ থাক। তোর নামে অন্তত নতুন কোনো প্রেমকাহিনি ছড়ানোর সুযোগ দিস না!’

তারপরও মাঝে মাঝে ভাবি, চুলে তেল মেখে, চোখে চশমা দিয়ে, ঠোঁটে গান তুলে প্রেমের চিঠি লিখব। কাগজের ওপর কলম চলবে, শব্দের মধ্যে থাকবে আবেগ, আর বাক্যের শেষে থাকবে দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। চিঠি লেখার আগেই মনে পড়ে যায়, মাসের বেতন থেকে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত আর অন্যান্য খরচ বাদ দিলে রোমান্টিক হওয়ার মতো কত টাকা অবশিষ্ট থাকে? প্রেমের চিঠিতে লিখব, ‘তোমার জন্য চাঁদ এনে দেব।’ অথচ নিজের ঘরের বিদ্যুৎ বিল দিতে গিয়ে চাঁদের আলোতেই বসে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে!

তবে আমার সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, মানসিকও নয়। সংকটটা হলো আমি কীভাবে কারও সামনে দাঁড়াব? নিজের জীবনটাই যেখানে এখনো গুছিয়ে উঠতে পারিনি, সেখানে আরেকজন মানুষকে স্বপ্ন দেখানোর সাহস কোথায় পাব? ভালোবাসা তো শুধু কাউকে ভালো লাগার নাম নয়; ভালোবাসার সঙ্গে দায়িত্ব আছে, সম্মান আছে, ভবিষ্যতের কথা আছে। আমি কাউকে পছন্দ করলেই তাকে নিজের অনিশ্চয়তার মধ্যে টেনে আনতে চাই না। এই ভাবনাটা কখনো দায়িত্ববোধ, কখনো আত্মবিশ্বাসের অভাব হয়ে দাঁড়ায়। পার্থক্যটা বুঝতে বুঝতেই জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়।

আর বয়স বত্রিশ হয়ে গেলে সমাজের ক্যালকুলেটরও বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন, ‘বিয়ে করছ না কেন?’ বন্ধুরা বলে, ‘কাউকে পছন্দ কর।’ পরিচিতরা বলে, ‘তোর তো অনেক সুযোগ!’ তাঁদের বোঝাই কী করে, সুযোগ আর সাহস এক জিনিস নয়। কেউ দরজা খুলে দিলেই ঘরে ঢোকা যায় না; নিজের ভেতরেও প্রবেশের অনুমতি লাগতে পারে। আমি সেই অনুমতির অপেক্ষায় আছি কি না, নাকি ভয়কে ভদ্রতার পোশাক পরিয়ে রেখেছি সেটাও মাঝে মাঝে বুঝতে পারি না।

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় রসিকতা হলো, আমি সংবাদ সম্পাদনা করতে শিখছি, অথচ নিজের জীবনের শিরোনামটাই এখনো ঠিক করতে পারিনি। অন্যের খবরের ভুল ধরতে পারি, কিন্তু নিজের মনের ভুলগুলো সম্পাদনা করতে বসলে কলম থেমে যায়। অফিসে নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু হয়, নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়; কিন্তু হৃদয়ের ডিউটি কখন শুরু হয় আর কখন শেষ হয়, তার কোনো রোস্টার নেই। আর প্রেমের ব্রেকিং নিউজ তো আরও বিপজ্জনক একবার ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেদন সংশোধন করেও আগের শিরোনাম মুছে ফেলা যায় না!

তবু আমি আশাবাদী। কারণ, মধ্যবিত্তের পকেট ছোট হতে পারে, স্বপ্নের বাজেট সীমিত হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের অনুভূতিগুলোকে পুরোপুরি বাতিল করা যায় না। হয়তো একদিন এমন কাউকে পাব, যার সামনে দাঁড়াতে গিয়ে বিশ হাত দূরে পালাতে হবে না। যে আমার বেতনের অঙ্কের চেয়ে আমার সততা, আমার সামাজিক অবস্থানের চেয়ে আমার দায়িত্ববোধ, আর আমার বাহ্যিক গাম্ভীর্যের চেয়ে ভেতরের মানুষটিকে গুরুত্ব দেবে। হয়তো সেদিন প্রেমের চিঠি লেখার আগে আর ক্যালকুলেটর খুলতে হবে না।

তত দিন পর্যন্ত আমি সংবাদ সম্পাদনা করব, নিজের জীবনটাকেও একটু একটু করে সম্পাদনা করব। ভুল বানান শুধরে নেব, অসমাপ্ত বাক্য শেষ করব, অপ্রয়োজনীয় ভয়গুলো বাদ দেওয়ার চেষ্টা করব।

চোখ নামিয়ে বিশ হাত দূরে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলব কি না, তা এখনই বলতে পারছি না। তবে একদিন হয়তো চোখ তুলে হাসব। মেয়েটি হাসলে কথা বলব, না হাসলে ভদ্রভাবে নিজের পথে চলে যাব। অন্তত মনে মনে এই সান্ত্বনাটুকু রাখব। সব হাসির পেছনে প্রেম থাকে না, আর সব নীরবতার পেছনেও অহংকার থাকে না।

কারণ, আমি বত্রিশ বছরের এক মধ্যবিত্ত সংবাদকর্মী। আমার প্রেমের অভিজ্ঞতা কম, বেতনের অঙ্ক ছোট, ভবিষ্যতের হিসাব দীর্ঘ। তবু আমারও একটা হৃদয় আছে। শুধু সমস্যা হলো, হৃদয়টা প্রেমের সংবাদ প্রকাশ করতে চায়, আর মাথাটা প্রতিটি প্রতিবেদনের আগে জানতে চায়, ‘তথ্য-প্রমাণ আছে তো? আর মাসের খরচ চলবে তো?’

আমার প্রেমের সংবাদ আজ প্রকাশ হল।

Related posts

লন্ডনে জমকালো আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ইউকে বাংলা ব্যান্ড ফেস্ট ২০২৬

মডেল রিধিকার মৃত্যু: আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় বন্ধু গ্রেপ্তার

আদালতে হাজির হয়ে জামিন পেলেন তানজিন তিশা