আইসিসির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ‘নজিরবিহীন ও অগ্রহণযোগ্য’: নাভি পিল্লাই

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে ‘নজিরবিহীন ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নাভি পিল্লাই। তার মতে, বিচারিক আদেশ বা রায় দেওয়ার কারণে বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাইকে শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রসারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, তার অবদান একটি সুসংহত বৈশ্বিক আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছে।

তবে নোবেলজয়ী হিসেবে নাভি পিল্লাইয়ের নাম ঘোষণার পরপরই ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটন আইসিসির বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

মার্কিন এই পদক্ষেপকে আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মূল ভিত্তির ওপর মারাত্মক আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে আইসিসি।

শনিবার অসলোর নোবেল পিস সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে ৮৫ বছর বয়সী নাভি পিল্লাই বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিচারালয়গুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ঘিরে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, কেবল বিচারিক আদেশ বা রায় দেওয়ার কারণে একটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হচ্ছে। এমন ঘটনা ইতিহাসে নজিরবিহীন ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’

এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছিলেন, আইসিসির সঙ্গে মার্কিন কোনো প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘আমেরিকার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা’। আদালতটির বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করার চেষ্টা চালানোর অভিযোগও আনেন তিনি।

এর আগেও আইসিসির ১৭ জন বিচারক ও কর্মকর্তার ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল ওয়াশিংটন। তবে এবার সরাসরি পুরো আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

নতুন নিষেধাজ্ঞার কিছু শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার আগে ছয় মাসের ছাড় দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। এর ফলে সদস্যরাষ্ট্রগুলো আপাতত আইসিসির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তহবিল সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারবে। ওয়াশিংটনের দাবি, তাদের উদ্বেগ নিরসনে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য সদস্যদেশগুলোকে সময় দিতেই এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, আইসিসি পরিচালনা করছেন একদল ‘বিশ্বায়নবাদী’, যারা মার্কিন সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

এর আগে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কথিত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে নতুন নিষেধাজ্ঞার নোটিশে ওই পরোয়ানা প্রত্যাহারের কোনো শর্ত দেওয়া হয়নি।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মার্কিন সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর মারাত্মক আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও নেদারল্যান্ডসও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত প্রকাশ করেছে।

বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সাবেক আইনজীবী নাভি পিল্লাই দীর্ঘ কর্মজীবনে রুয়ান্ডা, মিয়ানমার ও গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণার পর ট্রাম্প একে ‘লজ্জাজনক ও অপমানজনক’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি পুরস্কার ঘোষণাকে ‘নরওয়ের গায়ে এক চিরস্থায়ী দাগ’ বলেও অভিহিত করেন। দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার তারই পাওয়া উচিত।

Related posts

শিক্ষায় বিনিয়োগ ও সামরিক সেবার বাধ্যবাধকতা বাতিলের দাবিতে জার্মানিতে জেন জি বিক্ষোভ

জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিবাদে ফ্রান্সে বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ২৯০

সাইবার হামলায় চুরি হওয়া অর্থের ৯০ শতাংশ পূরণ করল বাইন্যান্স