গাজী নজরুলের এমপি পদ থাকবে, নাকি শূন্য হবে—যে প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দল থেকে বহিষ্কার করলেই তার এমপি পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবে কি না, নাকি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত হবে—এ নিয়ে আলোচনা চলছে।

জামায়াতে ইসলামী গত ২২ জুলাই গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ জানায়, সাংগঠনিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে ওঠা নৈতিক স্খলনের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার পর দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। পরদিন ইসি ও জাতীয় সংসদের স্পিকারকে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

তবে শুধু দল থেকে বহিষ্কারের চিঠির ভিত্তিতে ইসি সরাসরি কোনো সংসদ সদস্যের পদ বাতিল করতে পারে না। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, সংসদ থেকে আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স পাওয়ার পরই কমিশন আইন অনুযায়ী বিষয়টি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, দল থেকে পদত্যাগ এবং সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ—দুটি আলাদা বিষয়।

 

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা এবং এ-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। অনুচ্ছেদ ৬৬(৪) অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর অযোগ্য হয়েছেন কি না বা কোনো সদস্যের আসন শূন্য হওয়া উচিত কি না—এ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ‘Members of Parliament (Determination of Dispute) Act, 1980’ বা সংসদ সদস্যপদ বিরোধ নিষ্পত্তি আইন, ১৯৮০ প্রযোজ্য। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও আইনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন-সংক্রান্ত আইনের তালিকায় রয়েছে।

আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে স্পিকার ৩০ দিনের মধ্যে বিরোধ-সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের নাম-ঠিকানা এবং বিরোধ উত্থাপনকারী ব্যক্তির নাম-ঠিকানাসহ একটি বিবরণী প্রস্তুত করে নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন। এরপর কমিশন ওই বিরোধ শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য গ্রহণ করবে।

 

স্পিকারের কাছ থেকে রেফারেন্স পাওয়ার পর আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ১৪ দিনের মধ্যে বিরোধের বিবরণী সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে পাঠাবে এবং তাদের লিখিত বক্তব্য দিতে বলবে।

নির্ধারিত সময়ের পর কমিশন শুনানির তারিখ, সময় ও স্থান নির্ধারণ করবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিজেরা উপস্থিত হয়ে অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারবেন। একই সঙ্গে তাদের প্রমাণ উপস্থাপন এবং সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগও থাকবে।

আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, বিরোধ শুনানি ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন দেওয়ানি আদালতের মতো কিছু ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এর মধ্যে ব্যক্তিকে তলব করা, শপথের মাধ্যমে জবানবন্দি নেওয়া, নথি তলব ও উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া এবং সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য কমিশন গঠনের ক্ষমতা রয়েছে। এ আইনের অধীনে ইসির কার্যক্রম দণ্ডবিধির ১৯৩ ধারার অর্থে বিচারিক কার্যক্রম হিসেবে গণ্য হয়।

 

আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী, স্পিকারের কাছ থেকে বিরোধের বিবরণী পাওয়ার পর সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে তার সিদ্ধান্ত স্পিকারের কাছে জানাতে হবে।

অর্থাৎ জামায়াতের বহিষ্কারের চিঠি পাওয়ার পরই গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ শূন্য হয়ে যাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হবে না। সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বিষয়টি স্পিকারের মাধ্যমে ইসিতে রেফার হতে হবে এবং এরপর কমিশন আইন অনুযায়ী শুনানি ও পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসি নিজেও জানিয়েছে, সংসদ থেকে রেফারেন্স না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কমিশনের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই।

 

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে দলীয় সিদ্ধান্ত বা দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে সংসদ সদস্যের পদ নিয়ে বিরোধের নজির রয়েছে। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত তৎকালীন সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ নিয়ে বিরোধ স্পিকার নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়েছিলেন। এরপর ‘Members of Parliament (Determination of Dispute) Act, 1980’ অনুযায়ী ইসি বিষয়টি শুনানির প্রক্রিয়ায় নেয়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে লতিফ সিদ্দিকী নিজেই সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের দলীয় অবস্থান ও সদস্যপদ নিয়ে অতীতেও একাধিক বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সংসদীয় রেফারেন্স ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে এখন মূল বিষয় হলো—তার বহিষ্কারের পর সংসদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ইসি জানিয়েছে, সংসদ থেকে রেফারেন্স পেলে কমিশন তদন্ত ও শুনানির মাধ্যমে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। রেফারেন্স না পাওয়া পর্যন্ত শুধু দলীয় বহিষ্কারের কারণে তার সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হচ্ছে না।

ফলে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের পদ থাকবে কি না, সেটি এখনই চূড়ান্ত নয়; বিষয়টি নির্ভর করবে পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশনের শুনানি এবং আইনি সিদ্ধান্তের ওপর।

 

Related posts

সৌদির সামরিক চাহিদা পূরণে প্রস্তুত তুরস্ক, জানালেন ফিদান

আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা, নিহত ৩

হরমুজে মার্কিন এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইরানের