বিরোধীদের কর্মসূচিতে নজর বিএনপির, পাল্টা কর্মসূচিতে নেই আগ্রহ

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোটের লংমার্চসহ ধারাবাহিক কর্মসূচির ওপর নজর রাখছে বিএনপি। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর এসব কর্মসূচির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সংসদ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে এসব কর্মসূচির জবাব দেওয়া হলেও আপাতত বিরোধীদের তৎপরতাকে বড় কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে না দলটি। ফলে পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার কথাও এখন ভাবছে না বিএনপি।

দলটির নেতারা বলছেন, সরকারে থেকে বিরোধীদের কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার চেয়ে সংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছে। তবে দলের একটি অংশ মনে করে, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, দ্রব্যমূল্যসহ জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে বিরোধীরা ধারাবাহিকভাবে মাঠে থাকলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছে তারা। অন্যদিকে বিএনপি এখন পর্যন্ত কোনো পাল্টা কর্মসূচি দেয়নি। এ অবস্থায় বিরোধীদের তৎপরতাকে ক্ষমতাসীন দল কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমরা বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচিকে গণতান্ত্রিক চর্চার একটা অংশ হিসেবে দেখছি। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার অধিকার সবার আছে। আমরা এটাকে সেভাবেই দেখছি, এর বেশি কিছু না।’

তবে বিএনপির এই অবস্থানকে ভিন্নভাবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘বিরোধী দলের কর্মসূচিকে গুরুত্ব না দিলে কি সংসদে প্রতিক্রিয়া দেয়? আমরা মনে করি, সরকারি দলের পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার ক্যাপাসিটি নেই, বিএনপির আগের সেই নৈতিক অবস্থানও নেই।’

 

জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের সমাধান, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোট গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করে। এরপর আজ রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করছে জোটটি। পর্যায়ক্রমে খুলনা, সিলেটসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহর অভিমুখেও একই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে তারা।

প্রথম দফার লংমার্চের বিভিন্ন পথসভা থেকে সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দেন বিরোধী দলের নেতারা। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান কয়েকটি পথসভায় বলেন, দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকট রয়েছে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগও তোলেন তিনি।

ফেনীর মহিপালের পথসভায় সরকারকে আরও সরাসরি আক্রমণ করে শফিকুর রহমান বলেন, এ সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কারও চোখ রাঙানি সহ্য করব না। আমরা যেখানে বাধা পাব, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’

 

বিরোধীদের এসব বক্তব্য ও কর্মসূচির জবাবে বিএনপি এখন পর্যন্ত সংসদ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও লংমার্চের উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

জ্বালানি সংকটের সমাধানে লংমার্চ প্রসঙ্গে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কি না? গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।’

বিরোধীদের লংমার্চের সমালোচনা করেছেন সরকারের অন্য নেতারাও। তাদের বক্তব্যে কর্মসূচিটির যৌক্তিকতা, জ্বালানি সংকটের বাস্তবতা এবং সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের ভাষ্য, বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণে এখনই এমন কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, যার জন্য দলকে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। বিরোধীদের কর্মসূচির ওপর নজর থাকলেও রাজপথে একই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে জবাব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন না তারা।

দলটির নেতারা মনে করেন, কর্মসূচি পালন বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার। তবে কোনো কর্মসূচির কারণে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হলে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। ফলে আপাতত সরকারি কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে বিরোধীদের মোকাবিলার কৌশলেই থাকতে চায় বিএনপি।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, বিরোধীদের কর্মসূচিকে আপাতত বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে না ক্ষমতাসীন দল। দলের ভেতর থেকেও বলা হচ্ছে, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বদলেছে।

প্রায় দুই দশক বিরোধী রাজনীতিতে থাকার সময় রাজপথের আন্দোলন ছিল বিএনপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার। এখন সরকার পরিচালনাই দলের প্রধান দায়িত্ব হওয়ায় বিরোধীদের কর্মসূচির জবাবে একই ধরনের কর্মসূচিতে যাওয়ার তাগিদ নেই বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।

তবে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের মতো জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে বিরোধীরা নিয়মিত কর্মসূচি চালিয়ে গেলে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান ও নেওয়া পদক্ষেপ জনগণের কাছে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন হতে পারে বলে দলের ভেতরের একটি অংশ মনে করছে।

ক্ষমতায় আসার পর দলীয় সংগঠন কতটা সক্রিয় রয়েছে, সেই প্রশ্নও বিএনপির সামনে আসছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটি অংশ মন্ত্রিসভা, সংসদ ও প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। এর মধ্যে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিও রয়েছে।

এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে বিএনপি কতটা সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিরোধী দলগুলো ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক তৎপরতার বিষয়টিও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

Related posts

সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালাচ্ছে হুথি, বাড়তে পারে লক্ষ্যবস্তু

রাশিয়ার তেল-গ্যাস কেনা দেশগুলোর পণ্যে ১০০% শুল্কের পথ খুলল যুক্তরাষ্ট্রে

গাজীপুরকে আদর্শ সিটি গড়ার অঙ্গীকার, সারদাগঞ্জে আরসিসি ঢালাই কাজের উদ্বোধন