আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে টেক্সাসে বসবাসরত এক আফগান নারীকে দেশটি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে ‘এলিয়েন টেররিস্ট রিমুভাল কোর্ট’ নামে গোপনীয় একটি বিশেষ আদালত।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৩০ বছর আগে ‘বিদেশি সন্ত্রাসীদের’ বহিষ্কারের জন্য গঠিত স্বল্পপরিচিত এই আদালতের মাধ্যমে মার্কিন বিচার বিভাগের পরিচালিত এটিই প্রথম মামলা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এবং ওই নারীর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ৪৭ বছর বয়সী নাজিরা হাজি জাদা আদালতে নিজের মামলা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৯৬ সালে ‘এলিয়েন টেররিস্ট রিমুভাল কোর্ট’ (এটিআরসি) গঠন করা হয়। তবে জুলাইয়ে নাজিরা হাজি জাদার মামলার আগে এই আদালতে কখনো কোনো মামলার শুনানি হয়নি। জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত গোপন প্রমাণের ভিত্তিতে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগের মুখে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন—এমন ব্যক্তিদের বহিষ্কারের জন্য আদালতটি গঠন করা হয়েছিল।
নাজিরা হাজি জাদার আইনজীবীরা যুক্তি দেন, এই মামলা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নিশ্চিত করা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার লঙ্ঘন করেছে। তাদের দাবি, নাজিরার বিরুদ্ধে কখনো সরাসরি কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি।
তবে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগে তার ছেলে ও জামাতাকে বিচারের মুখোমুখি করেন মার্কিন প্রসিকিউটররা। পরে তারা দোষী সাব্যস্ত হন।
নাজিরার ছেলে আবদুল্লাহ হাজি জাদা এবং জামাতা নাসির আহমদ তাওহিদ—দুজনকেই ২০২৪ সালের নির্বাচনের দিন ব্যাপক গুলির ঘটনা ঘটানোর ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ ছিল, তারা ইসলামিক স্টেটের মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ওই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন।
টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে বসবাসকারী নাজিরা হাজি জাদাকে প্রসিকিউটররা ওই পরিবারের ‘মাতৃপ্রধান’ হিসেবে অভিযুক্ত করেন। তাদের দাবি, তিনি পরিবারের সদস্যদের উগ্রপন্থি করে তুলতে ভূমিকা রেখেছিলেন।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানায়, নাজিরা হাজি জাদা নিজেকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী’ হিসেবে স্বীকার করেছেন এবং বহিষ্কার আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের অধিকার ত্যাগ করেছেন। এর ফলে তার আগের অভিবাসন মর্যাদা বাতিল করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক মামলার ফলে এই বিদেশি সন্ত্রাসীকে দ্রুত তার নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের জন্য একটি বিজয়।’
তিনি আরও বলেন, যারা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন ও প্রশ্রয় দেয়, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা উচিত নয়। এটিআরসির সামনে প্রথম এই মামলা দেখিয়ে দিয়েছে, দেশকে সুরক্ষিত রাখতে বিচার বিভাগ তার হাতে থাকা প্রতিটি উপায় কীভাবে ব্যবহার করতে পারে।
অন্যদিকে নাজিরা হাজি জাদার আদালত-নিযুক্ত আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তাদের মক্কেলের মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদি দেখার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
পাবলিক ডিফেন্ডার ম্যাথিউ ফার্লি ও মেরি ম্যানিং পেট্রাস ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, নাজিরা হাজি জাদার বহিষ্কারে সম্মতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে এই আদালতের বৈধতার প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তারা বলেন, আইনগতভাবে স্থায়ী বাসিন্দাদের আদালতে হাজির করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে, অথচ তাদের বা তাদের আইনজীবীদের সংশ্লিষ্ট অভিযোগের প্রমাণ দেখানো হবে না—এটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
আইনজীবীদের দাবি, কোনো বিচারক যখন বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করবেন, তখন ‘এলিয়েন টেররিস্ট রিমুভাল কোর্ট’কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে।
এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং গোপন প্রমাণের ভিত্তিতে বিশেষ আদালতের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।