৫৫ বছর পর বদলাচ্ছে অর্থবছর, এপ্রিল-মার্চে কী কী পরিবর্তন আসছে

প্রায় ৫৫ বছর পর বাংলাদেশের অর্থবছরের সময়সূচিতে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে বর্তমান জুলাই-জুনের পরিবর্তে এপ্রিল-মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসেবে নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন নিয়মে অর্থবছর শুরু হবে ১ এপ্রিল এবং শেষ হবে ৩১ মার্চ।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কে অর্থবছর হিসেবে গণনা করা হয়। সরকারের বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, সরকারি আয়-ব্যয় এবং বিভিন্ন আর্থিক হিসাবও এই সময়সূচির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।

নতুন ব্যবস্থা চালুর আগে ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে রূপান্তরকাল হিসেবে ধরা হবে। ওই অর্থবছরটি ২০২৭ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে শেষ হবে। এরপর ২০২৮ সালের ১ এপ্রিল থেকে শুরু হবে নতুন অর্থবছর।

অর্থবছর পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে বর্ষাকালকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অর্থবছরের শেষ তিন মাস এপ্রিল, মে ও জুন। এ সময় দেশে বর্ষা শুরু হওয়ায় সড়ক, সেতু, পানি উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়।

সরকার মনে করছে, অর্থবছরের শেষ তিন মাস জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যাবে। এ সময় আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় প্রকল্পের কাজ দ্রুত ও মানসম্মতভাবে শেষ করার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে জুনের মধ্যে অর্থবছরের কাজ শেষ করার যে তাড়াহুড়ো দেখা যায়, সেটিও কমতে পারে।

অর্থবছর হলো সরকারের আয়-ব্যয় ও আর্থিক কার্যক্রম হিসাব করার জন্য নির্ধারিত ১২ মাসের সময়কাল। রাষ্ট্রের বাজেট, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয় এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি জিডিপি, রাজস্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও সরকারি ঋণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকের হিসাবেও অর্থবছর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষে জুলাই-জুন অর্থবছর চালু হয়, যা পাকিস্তান আমলেও বহাল ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ৩০ জুন ১৯৭২ পর্যন্ত একটি সংক্ষিপ্ত অর্থবছরের বাজেট দেন।

এরপর বাংলাদেশে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কেই অর্থবছর হিসেবে অনুসরণ করা হচ্ছে।

অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ করা হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। বর্ষা শুরুর আগেই বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে অর্থবছরের শেষ দিকে তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করা এবং বিল সমন্বয়ের প্রবণতাও কমতে পারে।

তবে শুধু অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করলেই বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের উন্নতি হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বারবার প্রকল্প সংশোধন, ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার মতো সমস্যাগুলোরও সমাধান প্রয়োজন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বাজেট বাস্তবায়নের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করলে বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন আসবে না। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বাজেট বাস্তবায়নে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সঙ্গে বর্ষার সরাসরি সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মো. আহসান হাবিব মনে করেন, নতুন অর্থবছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা, অর্থের সঠিক ব্যবহার ও দুর্নীতির মতো সমস্যার সমাধান না হলে শুধু সময় পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে না।

অর্থবছর পরিবর্তন শুধু ক্যালেন্ডারের কয়েকটি মাস পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরকারের পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে নতুন সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ বিভাগের বিভিন্ন সফটওয়্যার এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা হালনাগাদ করতে হবে। আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট, ব্যাংক ও বিমা খাতের করবর্ষ, কোম্পানির অডিটসহ বিভিন্ন আর্থিক সময়সীমাতেও পরিবর্তন আনতে হতে পারে।

এ ছাড়া সরকারি ক্রয়, অর্থছাড়, রাজস্ব আদায় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকেও নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। বিভিন্ন প্রকল্পের মেয়াদ ও আর্থিক হিসাবও নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান জুলাই-জুন অর্থবছর বিশ্বব্যাংকের অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সময়সূচির কিছুটা গুরুত্ব রয়েছে।

তবে কোনো আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার কারণে একটি নির্দিষ্ট অর্থবছর অনুসরণ করতে হয় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের আবহাওয়া, কৃষি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন সময়কে অর্থবছর হিসেবে অনুসরণ করে।

নতুন অর্থবছর কার্যকর করার কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নির্ধারণে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, লেজিসলেটিভ বিভাগ ও অর্থ বিভাগের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করবে।

সব মিলিয়ে, প্রায় ৫৫ বছর পর অর্থবছরের সময়সূচিতে এই পরিবর্তন বাংলাদেশের বাজেট ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে শুধু অর্থবছরের সময় পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় এবং আর্থিক জবাবদিহির ক্ষেত্রেও কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

Related posts

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের পাশে থাকবে ওআইসি

মৈত্রী পাইপলাইনে ভারত থেকে এলো ৪৭ লাখ লিটার ডিজেল

২৬ মন্ত্রণালয়-সংস্থার সঙ্গে ইসির প্রস্তুতিমূলক বৈঠক আজ