কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় সৌন্দর্যের আড়ালে বেদনা

এইচ এন আলম, কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ কক্সবাজার মহেশখালীর উপকূল ঘেঁষে সাগরের বুক চিরে ভেসে থাকা ছোট্ট দ্বীপ সোনাদিয়া।

নাম শুনলেই অনেকে ভাবেন প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য। সবুজ প্যারাবন, সাদা বালিয়াড়ি আর নীল সাগরের মিলনে এটি যেন এক অনন্য রূপকথা। কিন্তু বাস্তবে দ্বীপবাসীর কাছে সোনাদিয়া মানে কষ্ট, বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তার আরেক নাম।

দ্বীপটি গড়ে উঠেছে মাত্র দুইটি পাড়া নিয়ে। শত শত বছর ধরে জেলে পরিবার এখানে বসতি গড়েছে। মাছ ধরা, শুকনা মাছ উৎপাদন আর সাগরপাড়ের সামান্য সম্পদের ওপরই টিকে আছে তাদের জীবন। ইতিহাসে একসময় সোনাদিয়া ছিল জেলেদের ভরসার জায়গা, সমুদ্রপথে বাণিজ্যেরও কেন্দ্র। কিন্তু সময়ের পালাবদলেও উন্নয়ন যেন দ্বীপটিকে এড়িয়ে গেছে।
সোনাদিয়ায় যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নৌকা। সেতু নেই, জেটি নেই, সড়কও নেই। ঝড়-বৃষ্টি বা জোয়ার-ভাটার সময় নৌযাত্রা হয়ে ওঠে জীবনের ঝুঁকি। গর্ভবতী নারী বা অসুস্থ রোগীকে মূল ভূখণ্ডে নিতে হলে পরিবারের মানুষজন আতঙ্কে দিন কাটান। একজন স্থানীয় জেলে বললেন, “সাগর শান্ত থাকলে যাওয়া-আসা সহজ, কিন্তু ঝড় এলে নৌকা মানেই মৃত্যুফাঁদ।”
চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যত শূন্য। দ্বীপে নেই কোনো হাসপাতাল, নেই কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সামান্য জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে বড় ধরনের অসুখ- সবকিছুর জন্য দ্বীপবাসীকে ভরসা করতে হয় মহেশখালী বা কক্সবাজারের চিকিৎসাকেন্দ্রের উপর। অনেক সময় রোগী পৌঁছানোর আগেই ঝরে যায় প্রাণ। এক প্রবীণ বাসিন্দা বললেন, “প্রসব বেদনায় থাকা মেয়েকে নিয়ে মাঝরাতে নৌকা ছাড়তে হয়। ভাগ্য ভালো হলে বাঁচে, না হলে লাশ ফেরে।”

এ দ্বীপের শিক্ষার অবস্থা আরও করুণ। পুরো দ্বীপে আছে মাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য শিশুদের যেতে হয় মূল ভূখণ্ডে, যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। স্থানীয় এক শিক্ষক আক্ষেপ করে বললেন, “বই-পুস্তকের আলো এখানে থেমে যায় প্রাথমিক স্তরেই। অনেক মেধাবী শিশু ঝরে পড়ে স্কুল থেকে।”
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অভাবও নিত্যসঙ্গী। দ্বীপে কোনো বড় বাজার নেই। চাল, ডাল, তেলসহ সবকিছুই আসে মূল ভূখণ্ড থেকে। সাগর উত্তাল থাকলেই সরবরাহ বন্ধ হয়। তখন দ্বীপবাসী দিন কাটান অনাহারে-অর্ধাহারে।

স্যানিটেশন আর বিদ্যুতের চিত্রও হতাশাজনক। অধিকাংশ পরিবার এখনো খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে। বিদ্যুতের কোনো সংযোগ নেই; রাত নামলেই দ্বীপ ডুবে যায় অন্ধকারে। কয়েকটি পরিবার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে বটে, কিন্তু তা সবার নাগালে নয়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন প্রায় শূন্য। নেই কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নেই বিনোদনের স্থান। ঈদ, বিয়ে কিংবা উৎসবগুলো হয় নিস্তেজ পরিবেশে। দ্বীপবাসীর ভাষায়, “আমাদের জীবনটা যেন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক অচেনা দ্বীপ।”

পরিবেশ ও প্রতিবেশের সংকট সোনাদিয়াকে আরও বিপদে ফেলছে। সরকারি খাসজমি দখল করে প্যারাবন কেটে তৈরি হচ্ছে মাছের ঘের। ফলে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, ভেঙে পড়ছে প্রাকৃতিক বাঁধ।

নিরাপত্তার পরিস্থিতিও ভয়াবহ। দ্বীপে নেই কোনো পুলিশ ফাঁড়ি, নেই কোস্টগার্ড বা শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প। দস্যুদের দৌরাত্ম্যে মানুষ প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকে। চুরি, ছিনতাই, মাছ ধরার নৌকা লুট- এসব ঘটনা যেন নিত্যদিনের ব্যাপার।

সব মিলিয়ে সোনাদিয়া আজ প্রকৃতির স্বর্গ নয়, বরং টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক। অথচ দ্বীপবাসী এই ভূমি ছাড়তে চান না। তাদের টান সাগর, মাছ আর এই মাটির প্রতি ভালোবাসা। স্থানীয় এক তরুণ বললেন, “আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু আমাদের দ্বীপ ধ্বংস করে নয়। আমরা চাই সেতু, স্কুল, হাসপাতাল, নিরাপত্তা- আমরা চাই মানুষের মতো বাঁচতে।”

প্রশ্ন থেকে যায়- রাষ্ট্রের চোখ কবে পড়বে এই অবহেলিত দ্বীপে? সোনাদিয়ার মানুষ আজও অপেক্ষায় আছে- একটি সেতুর, একটি স্কুলের, একটি হাসপাতালের, একটি নিরাপদ জীবনের।

এ প্রসঙ্গে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হেদায়েত উল্যাহ্ দৈনিক মিল্লাত প্রতিবেদক কে বলেন- ভৌগোলিক কারণে সোনাদিয়ার মানুষ আসলই অসহায়, তবে বর্তমান সরকার সোনাদিয়া বিষয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আওতায় এ দ্বীপের জন্য একটি বড় অর্থের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় এখানে বনবিভাগের শসস্ত্র বিট স্থাপন করা হবে, দখল হওয়া জমি উদ্যোগসহ নতুন ভাবে ম্যানগ্রুপ ফরেস্ট বা প্যারাবন সৃজন করা হবে। বাকি সমস্যাগুলোও ক্রমান্বয়ে মূল্যয়ন করা হবে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

Related posts

না জানিয়ে আচমকা মন্ত্রীর আগমন পরিবার পরিকল্পনা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ

গাজীপুরে প্রথম কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত

উচ্ছেদ অভিযানে লন্ডভন্ড জৈনাবাজার: কোটি টাকার ক্ষতির মুখে শতাধিক ব্যবসায়ী