নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্যও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে আমন্ত্রণ পেলেও সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী এই সফরে যাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার।
বুধবার পর্যন্ত তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম।
গত জুলাইয়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানায় ভারত। এর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও জানানো হয়।
এরপর থেকেই আলোচনায় রয়েছে—ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে সেপ্টেম্বরে দিল্লি যাবেন কি না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
গত সোমবার তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান, ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন কি না।
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রীকে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সরকার গঠনের দিন একটি চিঠির মাধ্যমে তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
এদিকে, সোমবার তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সেদিনই ভারতে ফিরে যান ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
পরদিন নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের সংবাদ সম্মেলনেও বিষয়টি ওঠে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সফর এবং ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণ—দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অর্থাৎ, ভারত সরকারের কাছেও এখনো এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা যায়নি যে তারেক রহমান সেপ্টেম্বরে দিল্লি সফরে যাচ্ছেন।
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে দুই দেশের সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ব্রিকস সম্মেলনের পাশাপাশি দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হলে তা সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক সচিব মাশফি বিনতে শামস বলেন, সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে তারেক রহমানের সফরে যাওয়া উচিত।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক বিশ্লেষক মাহফুজুর রহমান বলেন, ব্রিকস সম্মেলনের আগের দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং পরদিন আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণ হলে সেটিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হতো। কারণ, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে।
২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ভারত। বাংলাদেশ এখনো ব্রিকসের সদস্য নয়। তবে জোটটির নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাদের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
বিমসটেক বা বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন হচ্ছে এমনই একটি আঞ্চলিক জোট। সদস্য দেশগুলোর সরকারপ্রধানেরা পালাক্রমে সংগঠনটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সাল থেকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ। সেই হিসেবে বর্তমান চেয়ারম্যান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। যোগাযোগ ও ভিসা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার দিকে এগোচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সেই সম্পর্ক আবারও চাপের মুখে পড়েছে।
বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অডিওর মাধ্যমে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। এ নিয়ে আগে থেকেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। পরে তার বক্তব্যের পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশ এবং বিষয়টি নিয়ে ভারতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মতে, ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। তার রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয়টিও সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মাশফি বিনতে শামস বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে। সেখানে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে গুরুত্ব দিতে হবে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থাকলেও নির্বাচন ও মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের সমর্থনের অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি করে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই ভারতবিরোধী মনোভাব আরও প্রকাশ্য হয়। সীমান্তে উত্তেজনা, ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী স্লোগান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ভারতের সমালোচনা বাড়তে দেখা যায়।
কূটনীতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের ভারতবিরোধী অবস্থানের কারণে বর্তমান সরকারও দিল্লি সফরের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
মাহফুজুর রহমান মনে করেন, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর অবস্থানের কারণে সরকার এ মুহূর্তে ভারতকেন্দ্রিক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা সতর্ক থাকতে পারে।
তবে সাবেক কূটনীতিকদের মতে, দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কাটিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিতে তারেক রহমানের ভারত সফর গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মাশফি বিনতে শামস বলেন, বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে আগ্রহী। এ ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজনে অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তবে মাহফুজুর রহমানের মতে, শুধু ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে নয়, ভারতের সঙ্গে একটি অর্থবহ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ থাকলেই প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর করা উচিত।
ফলে আমন্ত্রণ পাওয়ার পর প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের যোগদান এবং সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে এখনো কাটেনি অনিশ্চয়তা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা