যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই সরকারি কর্মচারী। তাঁদের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তিনজন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন করে কর্মচারী রয়েছেন। গ্রেপ্তার অন্য দুজন চাকরিপ্রত্যাশী।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র ও উত্তর সরবরাহের বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার চুক্তি করেছিল চক্রটি। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫) ও জাহাঙ্গীর (৩৮), অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩) এবং চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২)।
এসআরবি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক প্রবেশপত্র, স্ট্যাম্প, ব্যাংক চেক, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময় থাকলেও এর প্রায় এক ঘণ্টা আগে সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার পর ছায়া তদন্ত শুরু করে এসআরবি। এর ধারাবাহিকতায় ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট পর্যালোচনা করে প্রশ্নপত্র আদান-প্রদানের ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের একটি স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলের কাছে পাঠান। পরে চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয়।
এসআরবির দাবি, এ কার্যক্রমে আসাদুল, রুবেল, মফিজুল ও সুজনও যুক্ত ছিলেন। চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান এলাকা থেকে ইমদাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন এসআরবি-৪-এর সহায়তায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আসাদুল ইসলামকে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট বিশ্লেষণ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৫ অক্টোবর সাভার এলাকা থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। পরে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ১৬ অক্টোবর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রশ্নপত্রটি প্রথম কোথা থেকে এবং কার মাধ্যমে চক্রের হাতে পৌঁছেছিল, তা এখনো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, নূর মোহাম্মদ সকালে যে প্রশ্নপত্র পেয়েছিলেন, সেটি তাঁকে কে দিয়েছিল, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেননি।
নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর দাবি করেছেন, তাঁরা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। তাঁদের উল্লেখ করা ফেসবুক গ্রুপ ও আইডিগুলো যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।
এসআরবির এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস শনাক্ত করার পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়ায় এ বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, এখন পর্যন্ত ওই অধিদপ্তরের কারও সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি।