জুলাই জাতীয় সনদে বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। বিএনপিসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট এ প্রস্তাবে একমত হয়ে সনদে সই করলেও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)সহ পাঁচটি দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বলেছিল, বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় এ মুহূর্তে উচ্চকক্ষের প্রয়োজন নেই।
সনদের ‘আইনসভা’ অংশে বলা হয়েছে, সংবিধানে এমন বিধান যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশে একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে। এর নিম্নকক্ষ হবে জাতীয় সংসদ এবং উচ্চকক্ষ হবে সিনেট।
তবে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত থাকায় জুলাই সনদে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট নির্বাচনি ইশতেহারে এ বিষয়টি উল্লেখ করে জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করলে তারা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি ও নির্বাচনি ইশতেহারেও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে সম্প্রতি সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির মতবিনিময়ে বাংলাদেশে আদৌ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উচ্চকক্ষ গঠন হলে এর অতিরিক্ত ব্যয় কতটা যৌক্তিক হবে, সে প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।
এ বিষয়ে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনে আমরা (বিএনপি) জুলাই সনদে একমত হয়েছি। আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারেও সেটি বলা হয়েছে। এখন যেহেতু প্রশ্ন উঠেছে, বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে।’
জুলাই সনদে নিম্নকক্ষের নির্বাচনে পাওয়া ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্য নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। তবে বিএনপিসহ সাতটি রাজনৈতিক দল ও জোট এতে ভিন্নমত জানিয়েছে। তাদের প্রস্তাব হলো, নিম্নকক্ষের নির্বাচনে পাওয়া ভোটের অনুপাতে নয়, বরং প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হতে হবে।
উচ্চকক্ষে সংবিধান সংশোধন বিল পাঠানোর বিষয়েও বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তার যুক্তি, উচ্চকক্ষের সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হলে তাদের কাছে সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিল পাঠানো সমীচীন হবে না।
তবে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরাও সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না—এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা সংসদ সদস্যদের ভোটে আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হন। সে অর্থে তাদের জনপ্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, উচ্চকক্ষ গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের সংসদে যুক্ত করা, যারা সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে আসার সুযোগ নাও পেতে পারেন।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভায় উচ্চকক্ষ সাধারণত নিম্নকক্ষের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য ও অধিকতর পর্যালোচনার সুযোগ তৈরিতে এ ব্যবস্থা রয়েছে।
ভারতে উচ্চকক্ষ ‘রাজ্যসভা’, যুক্তরাষ্ট্রে ‘সিনেট’ এবং যুক্তরাজ্যে ‘হাউস অব লর্ডস’ নামে পরিচিত। বিভিন্ন দেশে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি ও ক্ষমতাও ভিন্ন।
উচ্চকক্ষের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আইন প্রণয়নে ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। নিম্নকক্ষ দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নিলে বা ত্রুটিপূর্ণ কোনো বিল পাস করলে উচ্চকক্ষে সেটি পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে বিল পর্যালোচনা, সাময়িকভাবে বিল আটকে রাখা এবং সুপারিশ করার সুযোগও অনেক দেশের উচ্চকক্ষে রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার কমিশনও নিম্নকক্ষে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে আইনসভায় ভারসাম্য তৈরির লক্ষ্যে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব করেছিল। তাদের বিবেচনায়, উচ্চকক্ষ আইনসভার একটি অতিরিক্ত তত্ত্বাবধায়নমূলক স্তর হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু উচ্চকক্ষ গঠন করলেই সংসদে ভারসাম্য নিশ্চিত হবে না। উচ্চকক্ষের সদস্য কীভাবে নির্বাচিত হবেন এবং তাদের কী ধরনের ক্ষমতা থাকবে—তার ওপরই মূলত এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
জুলাই সনদে উচ্চকক্ষকে মূলত সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ বিষয়েও বিএনপিসহ সাতটি দল ভিন্নমত জানিয়েছে। তবে উচ্চকক্ষে অন্যান্য বিল পর্যালোচনা, সাময়িকভাবে আটকে রাখা বা সুপারিশ করার সুযোগ রাখা হলে তা আইন প্রণয়নের মান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
এদিকে বিশেষ কমিটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়টি জুলাই সনদের আলোকে এগিয়ে নিতে চাইলেও সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। বিশেষ কমিটির পরবর্তী বৈঠক আজ রোববার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।