Home আজকের মিল্লাত কনটেইনারে অবরুদ্ধ ইসলামাবাদ, নতুন নাম ‘কনটেইনারাবাদ’

কনটেইনারে অবরুদ্ধ ইসলামাবাদ, নতুন নাম ‘কনটেইনারাবাদ’

A+A-
Reset

রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও বিরোধী দলের লং মার্চ ঠেকাতে হাজার হাজার ভারী শিপিং কনটেইনার বসিয়ে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে ব্যারিকেড দেওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাই মজা করে রাজধানীটির নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘কনটেইনারাবাদ’।

কনটেইনার দিয়ে সড়ক অবরোধের প্রভাব পড়েছে পরিবহন, ব্যবসা ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়। প্রতিদিন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন পরিবহন মালিক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীরা।

পরিবহন সংগঠন ও সরকারি কর্মকর্তাদের হিসাবে, ইসলামাবাদের বিভিন্ন সড়কে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ভারী কনটেইনার ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর অনেকগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন ট্রাক ও কনটেইনার। কিছু কনটেইনার বিদেশি শিপিং কোম্পানির মালিকানাধীন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় চার টন ওজনের এসব কনটেইনারের কিছুতে বালু ভরে আরও ভারী করা হয়েছে, যাতে সহজে সরানো না যায়।

কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে এমন পরিস্থিতি চলছে। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ইসলামাবাদমুখী লং মার্চকে কেন্দ্র করেই মূলত এই নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দলটি প্রথমে ২৭ সেপ্টেম্বর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিলেও পরে তা পিছিয়ে ৪ অক্টোবর নির্ধারণ করে। কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিও কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বিষয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির তারিখ বিবেচনায় নয়, সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এরই মধ্যে এর অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কনটেইনার দিয়ে সড়ক অবরোধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহন খাতে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে কর্তৃপক্ষ ২ হাজারের বেশি যানবাহন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এসব যানবাহনের অনেকগুলোতেই পণ্য ছিল।

এতে ট্রাকচালকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ইসলামাবাদ বা পাঞ্জাবের দিকে গেলে গাড়ি ও কনটেইনার জব্দ হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেক চালক উত্তরমুখী যাত্রা বন্ধ করে দিয়েছেন।

ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, জেহলাম, পেশোয়ার ও অ্যাটকসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রুটে এর প্রভাব পড়েছে। কেউ কেউ বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার অনেকে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই যাত্রা থামিয়ে দিচ্ছেন। এতে চালকদের আয় কমার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায়ও বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে।

দিনের পর দিন ট্রাক আটকে থাকায় চালকদের স্বাভাবিক আয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, চালকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হচ্ছে মালিকদের। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারায় বাড়তি চাপের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরাও।

 

রাজধানীর সড়ক অবরোধের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে করাচি বন্দরে। ইসলামাবাদমুখী পথে কনটেইনার জব্দ হওয়ার আশঙ্কায় ট্রাকচালকদের একটি অংশ উত্তর দিকে যাওয়া বন্ধ রাখায় বন্দরে পণ্যবোঝাই কনটেইনারের জট তৈরি হচ্ছে।

এর ফলে পণ্য খালাস ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহনকারীদের ব্যয়ও বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জব্দ থাকা একটি কনটেইনারের জন্য প্রতিদিন ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপি পর্যন্ত ডেমারেজ দিতে হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছাতে না পারার ক্ষতি এবং ট্রাক অলস পড়ে থাকার ব্যয়। ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নেওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থার আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপরই পড়ছে।

পাকিস্তানের পরিবহন খাত এমনিতেই মূল্যবৃদ্ধির চাপের মধ্যে রয়েছে। রয়টার্সের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে পরিবহন মূল্যসূচক বেড়েছে ২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ রুটে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। পরিবহনকারীদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

অর্থনীতি ও নগর ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর এই অচলাবস্থার ক্ষতি শুধু কনটেইনার ভাড়া বা পরিবহন খাতের সরাসরি লোকসানে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে রাজধানীর ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগ পরিবেশেও।

সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, একটি দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র দীর্ঘদিন অচল থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন ও সার্বিক বাজারব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি মিলে পাকিস্তানের অন্যতম বড় মহানগর অঞ্চল। নগরবিষয়ক গবেষক ড্যানিয়াল আদম খানের মতে, রাজধানীর যোগাযোগ ও ব্যবসা কার্যক্রম ব্যাহত হলে এর প্রভাব দেশের অন্যান্য অঞ্চল এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে কনটেইনারগুলো এখন শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি ঠেকানোর ব্যারিকেড নয়, রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনেরও অংশ হয়ে উঠেছে। তরুণ পার্কুর ও ক্যালিসথেনিকস খেলোয়াড় মুজাদ্দাদ আসরার এসব কনটেইনারের ওপর কসরতের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, প্রতিবছরই কোনো না কোনো সময় ইসলামাবাদে কনটেইনার আসে। এ কারণেই অনেকে মজা করে রাজধানীটিকে ‘কনটেইনারাবাদ’ বলে ডাকছেন।

তবে কনটেইনারের ওপর কসরত করা তরুণদের কাছে এটি নিছক বিনোদন হলেও, সেগুলোর পাশে দিনের পর দিন অপেক্ষা করা ট্রাকচালকদের কাছে এটি জীবিকা ও অনিশ্চয়তার গল্প।

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সোস্যাল মিডিয়াতে আমরা