Home আজকের মিল্লাত নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আগেই সতর্ক করবে টিসিবির এআই

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আগেই সতর্ক করবে টিসিবির এআই

A+A-
Reset

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা, সরবরাহে বিঘ্ন ও সম্ভাব্য বাজার সংকটের আগাম তথ্য পেতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-ভিত্তিক বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ এ পরিকল্পনার কথা জানান।

তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় ও বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এআইভিত্তিক এ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোথায় সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে বা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেটিও আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের বাজারের প্রবণতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের গতিবিধি বিশ্লেষণে এআইভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই উদ্যোগটি নেওয়া হচ্ছে। এটি টিসিবির মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

ফয়সল আজাদ বলেন, অনেক সময় কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পর টিসিবি বিষয়টি জানতে পারে। এআইভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে বৃষ্টিপাত, পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন, উৎপাদন, আমদানি, মূল্য, সরবরাহ ও পণ্যের প্রবাহসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া যাবে।

আগস্টের শুরুতে কাঁচা মরিচের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি আগেই শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে টিসিবি, বাণিজ্য, খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কমিটি কয়েক দফা বৈঠক করেছে।

চেয়ারম্যান জানান, প্রকল্পের টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) চূড়ান্ত হওয়ার পর বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হবে।অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে নতুন গুদাম নির্মাণ ও পুরোনো স্থাপনা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে টিসিবি। উত্তরা এলাকায় একটি নতুন গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো কয়েকটি ভবন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করা হবে।

টিসিবির নিজস্ব সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন বাড়ানো হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে ভাড়ায় গুদাম নেওয়ার ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চেয়ারম্যান জানান, স্বয়ংক্রিয় সরবরাহ ব্যবস্থার দিকেও এগোচ্ছে টিসিবি। পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন এবং নতুন মোবাইল অ্যাপ চালু হলে কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি ভোক্তারাও আরও সুবিধা পাবেন।নতুন ডিলার নিয়োগে সরকারি নীতিমালা অনুসরণের পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের যাচাই-বাছাই এবং অনলাইন লটারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানান ফয়সল আজাদ।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি ১ হাজার ৫০০ স্মার্টকার্ডধারীর জন্য একজন ডিলার রাখা হবে। বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ কমাতেই অনলাইন লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জরুরি পরিস্থিতিতে বাজারে হস্তক্ষেপের মাধ্যম হিসেবে ট্রাক সেল কার্যক্রমও রাখা হচ্ছে। তবে এটি নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে পরিচালনা করা হবে না। পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বা ঈদের মতো বিশেষ চাহিদার সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রাক সেল চালু করা হতে পারে।

টিসিবির কার্যক্রম পরিচালনায় জনবলসংকট, অর্থায়নের ব্যয়, পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাব এবং জেলা প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীলতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন চেয়ারম্যান।

বর্তমানে টিসিবিতে প্রায় ২৭৫ জন কর্মী রয়েছেন। বিপরীতে সংস্থাটির পণ্য ক্রয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছর প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পণ্য কিনেছে টিসিবি। চলতি অর্থবছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্রমবর্ধমান দায়িত্ব সামলাতে টিসিবির সাংগঠনিক কাঠামো সম্প্রসারণ এবং দেশের প্রায় ২১টি স্থানে কার্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাজারভিত্তিক পণ্য সংগ্রহ, লাভজনক বিক্রয় ও এআইভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণের মতো নতুন কার্যক্রম পরিচালনায় বিশেষায়িত জনবলও প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

অর্থায়ন প্রসঙ্গে ফয়সল আজাদ বলেন, পণ্য সংগ্রহের জন্য টিসিবি সাধারণত সরকারের কাছ থেকে ঋণ নেয়। তবে ভর্তুকির অর্থ পেতে দেরি হলে সুদের ব্যয় বেড়ে যায়। এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকেও ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তার মতে, তুলনামূলক কম সুদে বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া গেলে অর্থায়নের ব্যয় কমবে এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও হ্রাস পাবে।

টিসিবিতে আমদানি করা পণ্য সরবরাহকারী ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ভ্যাট বিধানেও পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন চেয়ারম্যান।

তার ভাষ্য, বিদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে টিসিবিতে সরবরাহকারী ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদকদের তুলনায় বেশি ভ্যাট ব্যয়ের মুখে পড়েন। এ সমস্যার সমাধান হলে আরও বেশি সরবরাহকারী টিসিবির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হবেন। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং পণ্য সংগ্রহের দাম কমার সুযোগ তৈরি হবে।

যোগ্য সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়লে সীমিতসংখ্যক দেশীয় উৎপাদকের ওপর নির্ভরতাও কমবে বলে মনে করেন তিনি।আগামী দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে ফয়সল আজাদ বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, পণ্যের মান বজায় রাখা এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সংগ্রহ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ কমানোই টিসিবির প্রধান লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ‘পণ্যের মানের সঙ্গে আমরা কোনো আপস করব না।’

ভোক্তাদের চাহিদা ও জরিপের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে টিসিবির পণ্যের তালিকায় নতুন পণ্য যুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

চেয়ারম্যান বলেন, টিসিবির পণ্য কেনা বাধ্যতামূলক নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী ভোক্তারা কম দামে এসব পণ্য কিনতে পারবেন।

চলমান সংস্কার, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, এআইভিত্তিক বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা, উন্নত পণ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে টিসিবিকে আরও দক্ষ করে তোলার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব উদ্যোগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংস্থাটির ভূমিকা আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন টিসিবির চেয়ারম্যান।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সোস্যাল মিডিয়াতে আমরা