এক দশক পর ভারত থেকে আসছে নতুন রেল কোচ, থাকছে যেসব আধুনিক সুবিধা

প্রায় এক দশক পর বাংলাদেশের জন্য আবারও নতুন যাত্রীবাহী রেল কোচ তৈরি করেছে ভারতের রেল কোচ ফ্যাক্টরি (আরসিএফ)। বুধবার (১২ আগস্ট) বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য তৈরি প্রথম রেকের ১৯টি লিংক হফম্যান বুশ (এলএইচবি) ব্রডগেজ কোচ কারখানা থেকে বের করা হয়েছে।

যাত্রীদের আরাম ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বাংলাদেশের রেল পরিচালনার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এসব কোচে বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত রিক্লাইনিং সিট, সিসিটিভি নজরদারি, অ্যালার্ম ব্যবস্থা, বেবি কেয়ার রুম ও নামাজের জন্য আলাদা কক্ষ। এমনকি অতিরিক্ত যাত্রী বহনের সময় ছাদে ওঠার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখে কোচের ছাদকে করা হয়েছে আরও শক্তিশালী।

ভারতের রেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে আরসিএফের সহযোগিতা শুরু হয় ২০১৫-১৬ সালে। ওই সময়ে বাংলাদেশকে ১২০টি এলএইচবি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে রাইটসের (RITES) মাধ্যমে আরসিএফকে আরও ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ তৈরির কার্যাদেশ দেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। সাত ধরনের বা ভ্যারিয়েন্টে এসব কোচ তৈরি করা হবে। এর মধ্য দিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালনাগত প্রয়োজন ও যাত্রীদের আরামকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন কোচগুলো বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে।

ভারতীয় রেলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম রেকটিতে রয়েছে তিনটি এসি স্লিপার কোচ, তিনটি এসি চেয়ার কার, ১১টি নন-এসি চেয়ার কার এবং দুটি পাওয়ার কার।

এলএইচবি কোচে প্রচলিত সুবিধার পাশাপাশি নতুন এসব কোচে বেশ কিছু নকশাগত পরিবর্তন ও উন্নয়ন যুক্ত করা হয়েছে।

নতুন কোচগুলোতে বিশেষভাবে নকশা করা রিক্লাইনিং সিট থাকছে। এসব আসনে স্টেইনলেস স্টিলের আর্মরেস্ট ও ফুটরেস্ট ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে যাত্রীরা প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক অবস্থানে আসনের হেলান পরিবর্তন করতে পারবেন।

যাত্রীদের সুবিধার জন্য কোচগুলোতে আরও থাকছে—

* এসি কোচে ফ্যান
* সমন্বিত সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা
* যাত্রীদের জন্য অ্যালার্ম ব্যবস্থা
* আংশিক খোলা যায় এমন জানালা
* শিশুদের যত্নের জন্য বেবি কেয়ার রুম
* নামাজের জন্য আলাদা কক্ষ

বাংলাদেশের রেলপথে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের বাস্তবতা বিবেচনায় কোচের ছাদেও বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রী ছাদে ওঠার কারণে যে বাড়তি ভার সৃষ্টি হতে পারে, তা সহ্য করার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে ছাদের কাঠামোতে।

দক্ষিণ এশিয়ার রেলভ্রমণে দীর্ঘদিনের এই বাস্তবতাকেও নতুন কোচের প্রকৌশল নকশায় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

নতুন কোচগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘ক্র্যাশওয়ার্দি’ নকশা। দুর্ঘটনার সময় কোচের ক্ষয়ক্ষতি ও কাঠামোগত বিকৃতি কমিয়ে যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়ানোই এই নকশার মূল লক্ষ্য।

এই নকশা ইউরোপীয় নিরাপত্তা মান EN-15227-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ মান পূরণ করতে কোচের মূল বডি শেলের নকশাতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

নতুন কোচগুলোতে বাংলাদেশের রেলওয়ের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাস্টমাইজড বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব কোচের বৈদ্যুতিক সিস্টেম ৪১৫ ভোল্টে পরিচালিত হবে।

অন্যদিকে, ভারতীয় রেলের প্রচলিত এলএইচবি কোচে সাধারণত ৭৫০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য তৈরি কোচগুলোতে ভারতের প্রচলিত মান সরাসরি অনুসরণ না করে স্থানীয় অবকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে নতুন এলএইচবি কোচগুলো শুধু ভারতীয় রেলের প্রচলিত কোচের অনুকরণ নয়। বাংলাদেশের রেলব্যবস্থার পরিচালনাগত চাহিদা, যাত্রীদের আরাম, নিরাপত্তা এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এসব কোচে বেশ কিছু বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়েছে।

প্রায় এক দশক পর ভারতের কাছ থেকে নতুন এই কোচ যুক্ত হলে বাংলাদেশের রেলযাত্রায় যাত্রীসেবার মান ও নিরাপত্তায় কতটা পরিবর্তন আসে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

Related posts

না জানিয়ে আচমকা মন্ত্রীর আগমন পরিবার পরিকল্পনা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ

৬৫ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার ১৬ প্রকল্প নিয়ে একনেক সভা শুরু

চার দিনের সরকারি সফরে জাপান গেলেন সেনাপ্রধান