ইসরায়েল তার সামরিক বাহিনী, অর্থনীতি ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অপূরণীয় ধসের মুখে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইতজাক ব্রিক। আন্তর্জাতিক বৈধতা ও মিত্রদের হারিয়ে দেশটি দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকিতে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

রোববার (১ নভেম্বর) ইসরায়েলের মারিভ দৈনিকে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে ব্রিক এসব কথা বলেন। বর্তমান পরিস্থিতিকে নিছক রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং দেশটির জন্য সর্বাত্মক ধস হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।

গত মঙ্গলবারের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফলকে ‘আমরা যেভাবে জানতাম, সেই ইসরায়েল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মৃত্যু সনদ’ হিসেবে অভিহিত করেন ব্রিক। তাঁর অভিযোগ, টেলিভিশন বিশ্লেষকেরা আসনসংখ্যা ও জোট গঠনের আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও দেশটির গভীর সংকটগুলো উপেক্ষা করছেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, তাঁদের সম্প্রচার ছিল ‘টাইটানিকের শেষ মুহূর্তগুলোতে অর্কেস্ট্রা বাজানোর মতো’।

মিলিটারি কলেজের সাবেক কমান্ডার এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেনা অভিযোগবিষয়ক সাবেক ওম্বুডসম্যান ব্রিকের মতে, ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে। তিনি লেখেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক বৈধতা ও মিত্রদের হারিয়েছি।’ তাঁর সতর্কবার্তা, দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব নয়।

ইসরায়েলের পদাতিক বাহিনী কাঠামোগত ধস ও মনোবল ভাঙনের শিকার হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত হুমকি একসঙ্গে মোকাবিলা করে দেশকে সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে সামরিক বাহিনী। ক্লান্ত ও দুর্বল সামরিক বাহিনী বড় ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কিংবা আঞ্চলিক যুদ্ধের সময় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের জাতীয় ঋণ বেড়ে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন শেকেল বা ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করেন ব্রিক। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র সরবরাহে বিধিনিষেধ এবং ক্রমবর্ধমান আর্থিক বিচ্ছিন্নতা দেশটির ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ইউরোপের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রস্তাবকে অনভিজ্ঞ ও অদ্ভুত বলে সমালোচনা করেন তিনি। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ইসরায়েলিদের ব্যক্তিগত সঞ্চয়ও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন ব্রিক।

দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলি সমাজ কেবল মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না, বরং এক ধরনের ‘নীরব গৃহযুদ্ধের’ অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও অন্যান্য দক্ষ পেশাজীবী দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এতে কয়েক দশকে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা হারাচ্ছে ইসরায়েল।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা করে ব্রিক অভিযোগ করেন, দক্ষতা ও সততার পরিবর্তে রাজনৈতিক নিয়োগ এবং অন্ধ আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ১২০ আসনের নেসেটে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে ইয়াশার পার্টির নেতা গাডি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো পক্ষই নিশ্চিত করতে পারেনি।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি