ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার উঠে আসছে আরব রাজনীতিক মনসুর আব্বাসের নাম। নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা আব্বাসকে ইসরায়েলের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে দেশটির বহুদলীয় রাজনীতিতে আব্বাসের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দল ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রাম)-এর সমর্থন ছাড়া নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর পক্ষে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হতে পারে। ফলে নির্বাচনের পর সরকার গঠনে আবারও ‘কিংমেকার’ হয়ে উঠতে পারেন এই আরব রাজনীতিক।
মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল রামের নেতা। নির্বাচনী প্রচারণায় ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে নেতানিয়াহু বলছেন, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে পরবর্তী সরকারের ক্ষমতার চাবিকাঠি চলে যেতে পারে আব্বাসের হাতে। এতে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে দাবি করছেন নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা।
তবে আব্বাসের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজার সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাঁর মূল মনোযোগ ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের অনেকে সহিংস অপরাধ, বৈষম্য ও আবাসনসংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হন।
নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় আব্বাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন তাঁর হাতে ক্ষমতার চাবিকাঠি চলে গেলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। অন্যদিকে আব্বাসের বক্তব্য, তিনি নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চান। একই সঙ্গে এমন একটি সরকার গঠনে ভূমিকা রাখতে চান, যেখানে আরব নাগরিকদেরও অংশগ্রহণ ও প্রভাব থাকবে।
আব্বাস বলেন, ‘এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে আমাদের কথা বলার সুযোগ থাকবে, আমাদের প্রভাব থাকবে।’
আব্বাসকে ঘিরে নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক প্রচারণা এবারের নির্বাচনে তাঁর সম্ভাব্য ভূমিকার গুরুত্বও তুলে ধরছে। এর আগেও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আব্বাসের গুরুত্ব বড় আকারে সামনে আসে ২০২১ সালে। সে সময় নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে অংশ নেন তিনি। এর আগে ইসলামপন্থী আরব দলগুলো সাধারণত সরকারের বাইরে থেকে নীতির সমালোচনা করত। রামের সরকারে যোগ দেওয়া ছিল সেই প্রচলিত অবস্থান থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন।
ওই জোটের ফলে টানা ১২ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর ক্ষমতা হারান নেতানিয়াহু। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রীর পদে ফেরেন তিনি।
আব্বাসের এই রাজনৈতিক কৌশল তাঁকে ইসরায়েলের অন্যতম প্রভাবশালী আরব রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে তাঁর অবস্থান নিয়ে আরব সম্প্রদায়ের মধ্যেও বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে তুলনামূলক কম সরব থাকা এবং ইসরায়েলি সরকারের অংশীদার হওয়ার কৌশল নিয়ে সমালোচনা রয়েছে তাঁর।
ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে আব্বাসের উত্থান এমন এক সময়ে, যখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা দেশটির ডানপন্থী ভোটারদের বড় অংশের কাছে অজনপ্রিয়। নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা আব্বাসকে সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, একসময় তাঁকে সাহসী রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রশংসা করা কিছু নেতানিয়াহুবিরোধী রাজনীতিকও এখন তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বেড়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকেরা। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায় হামাস।
হামলার দিনই আব্বাস এর নিন্দা জানান। পরে গাজা সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরায়েলিদের আবাসনের ব্যবস্থা করতেও সহায়তা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের সহিংসতা ফিলিস্তিনিদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তবে আব্বাসের এই অবস্থানের পরও সমালোচনা থামেনি। ইসরায়েলি হামলায় গাজায় বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পরও তিনি কেন আরও জোরালোভাবে প্রতিবাদ করছেন না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন আরব নাগরিকদের কেউ কেউ।
ইসরায়েলে আরব-ইহুদি সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করা প্রতিষ্ঠান অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের সহসভাপতি বাশার ফাহুম-জায়ৌসি বলেন, আব্বাসের রাজনৈতিক সমঝোতার কৌশল নিয়ে আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।
ইসলামিক মুভমেন্টের চেয়ারম্যান সাফওয়াত ফ্রেজের মতে, ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের সবাই আব্বাসের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তবে অনেকেই মনে করেন, সমঝোতা তাঁর রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ।
রাজনীতিতে আসার পেছনে আব্বাসের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গ্যালিলি অঞ্চলের দ্রুজ, খ্রিষ্টান ও মুসলিম অধ্যুষিত মাঘার শহরে জন্ম তাঁর। তাঁর বাবা ছিলেন মুদিদোকানি। ছোটবেলা থেকেই প্রতিবেশীদের বিরোধ মেটাতে ভূমিকা রাখতেন আব্বাস। স্কুলে পড়ার সময়ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সমস্যা সমাধানে তাঁকে মধ্যস্থতা করতে বলা হতো।
পেশাগত জীবনে আব্বাস ছিলেন দন্তচিকিৎসক। নিজ এলাকায় দ্রুজ ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। সহিংসতার কারণে বহু মানুষকে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত নিজের পেশাগত কাজ বন্ধ রেখেছিলেন তিনি।
মানুষের জন্য আরও বেশি কাজ করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন আব্বাস। তাঁর বিশ্বাস, বৃহত্তর পরিসরে মানুষের সেবা করতে হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগাতে হবে।
তিন সন্তানের বাবা মনসুর আব্বাস ২০১৯ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে নির্বাচিত হন। এরপর থেকে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অপরাধ ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছেন তিনি। এসব উদ্যোগের কারণে সংগঠিত অপরাধী চক্রসহ বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছেন বলেও জানিয়েছেন আব্বাস।
২০২১ সালের মে মাসে ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় আরব ও ইহুদিদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে আব্বাস লোড শহরের একটি পুড়ে যাওয়া সিনাগগ পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন শহরের কট্টরপন্থী ইহুদি মেয়র। সিনাগগটি পুনর্নির্মাণে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি সহিংসতার নিন্দা জানান তিনি।
তবে এ ঘটনায় ইসরায়েলি পুলিশের আরব নাগরিকদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে তাঁর নিজের সম্প্রদায়ের একাংশও তাঁর পদত্যাগ দাবি করে।
আব্বাসের যুক্তি, শুধু বিরোধিতা করে আরব নাগরিকদের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখতে হলে সরকারে অংশ নিতে হবে। এ কারণে প্রয়োজনে এমন কিছু নীতির দায়ও নিতে প্রস্তুত তিনি, যেগুলো আরব নাগরিকদের একাংশের কাছে অজনপ্রিয়।
আসন্ন নির্বাচনে আব্বাসের রাজনৈতিক কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্য-বামপন্থী ইহুদি রাজনীতিক ইয়াভ সেগালোভিচের সঙ্গে জোট গঠন। সাবেক এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা রামের প্রার্থী তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন আব্বাস।
নাজারেথে এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের একসঙ্গে উপস্থিতি ইসরায়েলের মূলধারার আরব ও ইহুদি রাজনীতির মধ্যে নতুন ধরনের সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছে।
সেগালোভিচ এর আগে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অপরাধ দমনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছিলেন তিনি। তাঁর দাবি, ওই উদ্যোগের সময় হত্যাকাণ্ডের হার ১৬ শতাংশ কমেছিল।
তবে ২০২২ সালে নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফেরার পর সেগালোভিচের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাতিল হয়ে যায় এবং হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়ে যায়। অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের মধ্যে রেকর্ড ২৫২ জন নিহত হয়েছেন।
আব্বাসের সঙ্গে সেগালোভিচের জোটকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে আরও কয়েকটি কারণে। সেগালোভিচ আরবি বলতে পারেন না। অন্যদিকে আব্বাস সমকামী অধিকারের বিরোধিতা করেন। সেগালোভিচ নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচয় দেন এবং এসব অধিকারের সমর্থক।
মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাঁদের একসঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয়, সরকার গঠনের সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক সহযোগিতাকে তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এক সাক্ষাৎকারে সেগালোভিচ বলেন, তিনি আব্বাসকে বিশ্বাস করেন। তাঁর মতে, আব্বাস একজন সাহসী মানুষ এবং সেই সাহসের জন্য তাঁকে মূল্যও দিতে হচ্ছে। ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার ক্ষেত্রে আব্বাসকে একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন তিনি।
উত্তর ইসরায়েলের সাখনিন শহরে নির্বাচনী প্রচারণার সময় আব্বাসের সঙ্গে কথা বলেন স্থানীয় ভোটার ইহসান বশির। নিজের এক ছেলে ও চার মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আব্বাসকে পরবর্তী সরকারে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। এমনকি সেই সরকারের নেতৃত্বে নেতানিয়াহু থাকলেও তাঁর আপত্তি নেই বলে জানান বশির।
তাঁর মূল প্রত্যাশা, এলাকায় সহিংসতা কমবে এবং সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
আব্বাসের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আরব নাগরিকদের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি ইহুদি ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখা। তাঁর রাজনৈতিক কৌশল কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনে রামের অবস্থান এবং সরকার গঠনের পর দলটি কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তার ওপর।
আসন্ন নির্বাচনে মনসুর আব্বাস আবারও সরকার গঠনের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারবেন কি না, সেটিই এখন ইসরায়েলের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।